সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণে মাজদার হোসেন মামলা এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে জ্বলজ্বল করছে। মাসদার হোসেন মামলার ধারাবাহিকতায় সরকার ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর ফৌজদারী কার্যবিধি সংশোধন করে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ পৃথক করে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের পদ প্রনয়ন করেন।
সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ক্ষেত্রে মাজদার হোসেন মামলার রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। নিম্নে বিখ্যাত মাজদার হোসেন মামলার আদ্যোপান্ত উপস্থাপন করা হলোঃ
প্রথম ধাপঃ
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের উদ্দেশ্যে জনাব মাজদার হোসেনসহ কতিপয় বিচার বিভাগীয় অফিসার ১৯৯৫ সালে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং- ২৪২৪ /৯৫ দায়ের করেছিলেন।
তাঁরা রিট পিটিশনে নিম্নোক্ত যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেনঃ
- জুডিসিয়াল সার্ভিসকে ১৯৮০ সালের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস আদেশ এর অধীনে অন্তর্ভুক্তিকরণ সংবিধান বহির্ভূত।
- সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগের দ্বিতীয় অধ্যায়ে অধস্তন বিচার আদালত সম্পর্কিত বিধান আছে সেখানে সংবিধানের দ্বারাই অধস্তন আদালতগুলো পৃথক হয়েছে। শুধুমাত্র সংবিধান ১১৫ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিধি প্রণয়ন করে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ কার্যকর করা সাংবিধানিকভাবে আবশ্যক।
- অধস্তন আদালতের বিচারকগণ বিচারক থাকাবস্থায় তাঁরা কোন ট্রাইবুনালের অধীন হতে পারেনা এবং এই ধরনের বিচার বিভাগীয় অফিসারগণ প্রশাসনিক ট্রাইবুনালের এখতিয়ারভুক্ত নহেন।
দ্বিতীয় ধাপঃ
বিষয়টির উপর ১৩ জুন ১৯৯৬ সাল থেকে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ শুনানির পর হাইকোর্ট বিভাগ ৭ মে ১৯৯৭ সালে রায় প্রদান করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপীল করে (দেওয়ানী আপীল নং- ৭৯/ ১৯৯৯) এবং আপীল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের উক্ত রায় নিরীক্ষণ করে ২ ডিসেম্বর, ১৯৯৯ তারিখে রায় প্রদান করে ( ৫২ ডি এল আর, ৮২ )।
রায়ে অন্যান্যের মধ্যে সরকারকে নিচের ০৫ (পাঁচ) টি নির্দেশনা (Direction ) প্রদান করা হয়ঃ
- সরকার অনতিবিলম্বে বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৫নং অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে বিধিমালা প্রণয়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্য হিসাবে পরিচিত এবং সুপ্রিমকোর্ট এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের সমন্বয়ে জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে ।
- বাংলাদেশ সংবিধানের ১৩৩ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে জুডিসিয়াল সার্ভিসের সদস্যদের পোষ্টিং, পদোন্নতি, ছুটি , শৃঙ্খলা, ছুটি ভাতা এবং সার্ভিসের অন্যান্য যেসব শর্ত থাকে সে সংক্রান্ত আইন বা বিধিমালা বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১৫ ও ১১৬ প্রণয়ন করতে হবে।
- বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৫নং অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে জুডিশিয়াল পে-কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৬নং অনুচ্ছেদ অনুসারে বিচারবিভাগীয় স্বাধীনতার শর্তাবলী যেমনঃ চাকুরীর মেয়াদের নিরাপত্তা, বেতন এবং অন্যান্য সুবিধাদি এবং পেনশনের নিরাপত্তা পার্লামেন্ট ও নির্বাহী বিভাগ হতে সাংবিধানিক স্বাধীনতা রচিত করে সংবিধানের ১৩নং অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন বা বিধিমালা প্রনয়ন করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে ।
- সুপ্রিমকোর্টের ফান্ডে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তা থেকে খরচ করতে হলে সুপ্রিমকোর্টকে নির্বাহী সরকার হতে সে বিষয়ে কোন অনুমোদন নেয়ার আবশ্যক নেই।
তৃতীয় ধাপঃ মামলার রায় বাস্তবায়ণ সংক্রান্ত
১৯৯৯ সালে রায় প্রদানের পরবর্তীতে ২০০০ সাল পর্যন্ত উক্ত রায় বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০১ সালে সরকার তিনটি আইন ও বিধিমালার খসড়া তৈরি করলেও এটা বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ আদালতের রায় হিসাবে মাজদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য আইনগত বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু উহা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
সুপ্রিমকোর্টের বারংবার চাপের মুখে সরকার নিম্নোক্ত চার (০৪) টি বিধিমালা তৈরি করেঃ
- বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন বিধিমালা, ২০০৪;
- বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস ( পে- কমিশন ) বিধিমালা, ২০০৬;
- বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস (গঠন, প্রবেশ পদে নিয়োগ এবং সাময়িক বরখাস্তকরন, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৬;
- বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরী, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বিধান এবং চাকুরীর অন্যান্য শর্তাবলী) বিধিমালা, ২০০৬।
উপরিউক্ত বিধিমালাসমূহ আপীল বিভাগের মতে ত্রুটিপূর্ণ ছিল। ফলে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উপরোক্ত চার (০৪) টি বিধিমালা বাতিল করে ২০০৭ সালে নতুন করে নিম্নোক্ত বিধিমালা জারী করেঃ
- বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন বিধিমালা, ২০০৭;
- বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পে- কমিশন বিধিমালা, ২০০৭;
- বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস (গঠন, প্রবেশ পদে নিয়োগ এবং সাময়িক বরখাস্তকরন, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৭;
- বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরী, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বিধান এবং চাকুরীর অন্যান্য শর্তাবলী) বিধিমালা, ২০০৭।
শেষ ধাপ (চূড়ান্ত পর্যায়): রায় বাস্তবায়ণের শেষ ধাপ
উপরিউক্ত বিধিমালাসমূহ জারীর পরপরই ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষে The Code of Criminal Procedure (Amendment) Ordinance, 2007 জারী করা হয়। ফল শ্রুতিতে ফৌজদারী কার্যবিধির মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়। ফৌজদারী আদালত ব্যবস্থাকে নতুন করে পুনর্গঠনপূর্বক বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করার পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা করা হয়।
উপরিউক্ত বিধিমালাসমুহ গেজেটে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে। ২০০৯ নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৭ সালের অধ্যাদেশের আলোকে ফৌজদারী কার্যবিধি (সংশোধনী) আইন ২০০৯ পাশ করে। এর মাধ্যমে মাজদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে ধরা হয়।
মাসদার হোসেন মামলা সর্ম্পকে যা মনে রাখা প্রয়োজনঃ
- জনাব মাসদার হোসেন ছিলেনঃ পেশায় একজন জজ
- রীট পিটিশন দায়েরঃ ১৯৯৫ সালে
- রীট পিটিশন নং: ২৪২৪/৯৫
- হাইকোর্ট বিভাগের রায়ঃ ৭ মে, ১৯৯৯ সালে
- হাইকোর্টে বিভাগের রীটকারীর পক্ষে রায়ে নির্দেশনা ছিলঃ ১২ টি।
- রায়ের বিরুদ্ধে আপীলঃ সরকার ১৯৯৯ সালে রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে আপীল দায়ের করেন।
- আপীল নং: ৭৯/১৯৯৯
- আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ঃ ২ ডিসেম্বর, ১৯৯৯ সালে [ আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায় বহাল রেখে চূড়ান্ত রায় প্রকাশ করে।]

Post A Comment:
0 comments: